
বাংলাদেশের নির্বাচন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ভারসাম্য: ইতিহাসের আলোকে এক পর্যালোচনা
--------এম এস ভূঁইয়া'
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন সবসময়ই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলের তিনটি নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হয়নি—এ অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়। তবে প্রশ্ন হলো, গত পঞ্চাশ বছরে কোন শাসনামলে সব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ছিল?
জিয়াউর রহমানের আমল: নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ক্ষমতায় আসেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৭ সালের ‘হ্যাঁ-না’ গণভোট, ১৯৭৮ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচন—সবগুলোই বিরোধী মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর রাজনৈতিক পরিবেশ এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল যে, ভিন্নমত প্রকাশ করাও ছিল কঠিন। সেই বাস্তবতায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আজও রয়ে গেছে।
১৯৮১ থেকে এরশাদ আমল: সামরিক প্রভাবের ধারাবাহিকতা
জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর ১৯৮১ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিচারপতি আবদুস সাত্তার বিজয়ী হন। সমালোচকদের মতে, সে নির্বাচনেও সামরিক বাহিনীর প্রভাব ছিল স্পষ্ট। পরে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং তাঁর শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়েও ব্যাপক বিতর্ক রয়েছে।
১৯৯১: গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সূচনা
বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯১ সালে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে নির্দলীয় অস্থায়ী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এটিই ছিল গণতান্ত্রিক ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণআন্দোলন
পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার পর বিএনপি ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন আয়োজন করে। বিরোধী দলগুলোর বর্জিত সেই নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। ভোটার উপস্থিতি, মৃত ভোটারদের ভোট এবং একতরফা ফলাফল নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত গণআন্দোলনের মুখে খালেদা জিয়াকে পদত্যাগ করতে হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সাংবিধানিক স্বীকৃতি পায়।
১৯৯৬ সালের জুন নির্বাচন: নতুন অধ্যায়
বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয় এবং শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচনটি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০০১ সালের নির্বাচন
বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ২০০১ সালের ১ অক্টোবর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি-জামায়াত জোট জয়লাভ করে এবং নির্বাচনটিও সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য বলে স্বীকৃতি পায়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়
২০০১-২০০৬ সময়কাল নানা কারণে আলোচিত। এ সময় জঙ্গিবাদের উত্থান, সংখ্যালঘু নির্যাতন, বাংলাভাইয়ের কার্যক্রম, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা এবং ১৭ আগস্ট দেশব্যাপী সিরিজ বোমা হামলার মতো ঘটনা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে।
২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকট
ক্ষমতার মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়। বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা পরিবর্তন, এম. এ. আজিজের নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াজউদ্দিন আহমেদের ভূমিকা নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে। শেষ পর্যন্ত আন্দোলনের মুখে নির্বাচন স্থগিত হয় এবং সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে।
২০০৮ সালের নির্বাচন
দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় অর্জন করে। নির্বাচনটি দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে।
বাংলাদেশের চারটি উল্লেখযোগ্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিম্নোক্ত চারটি নির্বাচন তুলনামূলকভাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়—
২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৯১
১২ জুন ১৯৯৬
১ অক্টোবর ২০০১
২৯ ডিসেম্বর ২০০৮
চারটিই অনুষ্ঠিত হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক বা অস্থায়ী সরকারের অধীনে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও ভারসাম্যের প্রশ্ন
বাংলাদেশে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। আওয়ামী লীগ, বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টি—কোনো আমলেই দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন সর্বসম্মত গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। পার্থক্য শুধু রাজনৈতিক ফলাফলে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য, গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতা এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী সরকার যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন কার্যকর বিরোধী দল ও সমঅধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক পরিব…