ঢাকা | বঙ্গাব্দ

অবিশ্বাসের বিশ্বে এক নতুন জোট

  • নিজস্ব প্রতিবেদক

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Aug 16, 2026 ইং
অবিশ্বাসের বিশ্বে এক নতুন জোট ছবির ক্যাপশন:

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান সম্প্রতি একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে, যাকে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই অভিহিত করছেন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ নামে। 

তবে শিরোনামের এই আকর্ষণীয় তকমার আড়ালে যে বাস্তবতা লুকিয়ে আছে, তা অনেক বেশি সূক্ষ্ম, অনেক বেশি হিসাবি। 

এর প্রকৃত গুরুত্ব সম্ভবত নিহিত রয়েছে কৌশলগত বিকল্প তৈরি, প্রতিরক্ষা শিল্পে পারস্পরিক সহযোগিতা এবং প্রতিটি রাষ্ট্রের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সম্প্রসারণের মধ্যে।

মক্কার সেই আয়োজনের দৃশ্যপটে ছিল খানিকটা নাটকীয়তা। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান সৌদি আরবে অবতরণের আগেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধান ওমরাহ পালন করেন। কয়েক ঘণ্টা পর শেহবাজ শরিফ, এরদোয়ান ও মোহাম্মদ বিন সালমান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, যেখানে বলা হয় তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে তা বিবেচিত হবে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে। এই প্রতীকী বার্তার জন্য বাড়তি কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়েনি। ইসলামের পবিত্রতম নগরী, মুসলিম বিশ্বের একমাত্র পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের সবচেয়ে গভীর কৌশলগত অর্থভাণ্ডার তিন শক্তির এই সমাবেশ স্বাভাবিকভাবেই ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা টেনে এনেছে।

তুলনা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে নানা কল্পনাও। পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব প্রায়ই নির্ভর করে দেশটি বাস্তবে কী করতে পারে তার চেয়ে বেশি, টেলিভিশন বিশ্লেষকরা কতটা উৎসাহ নিয়ে তাকে কী করতে পারে বলে কল্পনা করছেন, তার ওপর। 

ফলে চুক্তিটি দ্রুতই পরিণত হয়েছে ‘ইসলামিক বোমা’র পুনর্জাগরণ, সম্ভাব্য এক মুসলিম ন্যাটো, এমনকি কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেলের ভাষ্যে ইসরাইল, ভারত, ইরান প্রায় গোটা বিশ্বের বিরুদ্ধে এক সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ঢালের প্রতীকে। 

তুরস্কও তার পরিচিত নব্য-অটোমান আবেগ ও কৌশলগত অস্পষ্টতার মিশ্রণ নিয়ে এগিয়ে এসেছে। আর আরব বিশ্বের কিছু মহলে এই চুক্তিকে দেখা হয়েছে এমন প্রমাণ হিসেবে, যেন মুসলিম বিশ্ব অবশেষে ওয়াশিংটনের অনুমতির অপেক্ষা না করেই নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিখছে।

গল্পটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবতা, বিশেষত ইসলামাবাদের গণমাধ্যমের কল্পনার তুলনায়, অনেক বেশি জটিল।

মক্কা চুক্তি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, তবে তার গুরুত্ব এই কারণে নয় যে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান হঠাৎ এমন এক সামরিক জোট গড়ে তুলেছে, যেখানে এক দেশ অন্য দেশের যুদ্ধ করতে প্রস্তুত। বরং এর তাৎপর্য ঠিক তার বিপরীত জায়গায়। 

তিনটি রাষ্ট্র, যাদের স্বার্থ, ঝুঁকি ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক একে অপরের চেয়ে যথেষ্ট ভিন্ন, তারা এখন মনে করছে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা এতটাই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে যে তাদের প্রয়োজন অতিরিক্ত এক কৌশলগত ‘বীমা’। 

আর একই সঙ্গে তারা এটাও নিশ্চিত করতে চায়, সেই বীমা কখন এবং কীভাবে ব্যবহার করবে, সে সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা যেন থাকে সম্পূর্ণ নিজেদেরই হাতে।

চুক্তিটি বাস্তবে কী পরিবর্তন আনছে

এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন যখন সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় আঘাত করেছিল, তখনও সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বলবৎ ছিল। 

পাকিস্তান হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল, ‘অটল’ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছিল, আর ঠিক সেই কাজটিই করেছিল, যা সাধারণত রাষ্ট্রগুলো ভ্রাতৃত্বের ভাষা আর বাস্তব যুদ্ধের সম্ভাবনার মুখোমুখি হলে করে থাকে বিবৃতি দিয়েছিল।কোনো পাকিস্তানি বিমান ইরানি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়নি, কোনো পাকিস্তানি সেনাদল উপসাগর পেরোয়নি। ‘ইসলামিক বোমা’ ও রয়ে গিয়েছিল তার নিজের জায়গাতেই।

পরবর্তী সময়ে হুতিরা যখন সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করে, তখনও ইসলামাবাদ কথা বলেছিল আন্তর্জাতিক আইন, সংহতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ভাষায়। 

তবে পাকিস্তানি পতাকাবাহী জাহাজ ও নিজেদের সামুদ্রিক স্বার্থের প্রশ্নে তারা টেনেছিল আরও স্পষ্ট এক সীমারেখা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করেছিল, এসবের ওপর হামলা হলে আত্মরক্ষার অধিকার অনুযায়ী বৈধভাবে শক্তি প্রয়োগের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। শব্দচয়নের এই পার্থক্যটিই সবকিছু বলে দেয়। 

পাকিস্তান পাকিস্তানকে রক্ষা করতে প্রস্তুত, কিন্তু বাকিটা থেকে যায় আলোচনাসাপেক্ষ।

তুরস্কও সম্ভবত এর চেয়ে ভিন্ন আচরণ করবে না। সৌদি আরবের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোনো আগ্রহ আঙ্কারার নেই। একইভাবে ইসলামাবাদও এমন একটি সীমান্তে নতুন সংঘাতের ঝুঁকি নিতে চাইবে না, যার একাংশ ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল বেলুচিস্তানের মধ্য দিয়ে গেছে। 

তুরস্ক ও পাকিস্তান, উভয় দেশেরই তেহরানের সঙ্গে রয়েছে জটিল কিন্তু অপরিহার্য এক সম্পর্ক। এ কারণেই মক্কা চুক্তিকে ‘সুন্নি ন্যাটো’ নামে অভিহিত করা বাস্তবতার চেয়ে বিভ্রান্তিই বেশি তৈরি করে।

ন্যাটোর শক্তি কেবল ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে আছে সমন্বিত সামরিক কাঠামো, বহু দশকের পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতা ও যোগাযোগব্যবস্থা, স্থায়ী কমান্ড, যৌথ পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত নিরাপত্তা নিশ্চয়তা। তিন নেতা একটি চমৎকার সভাকক্ষে বসে ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’ ঘোষণা করলেই এসব কাঠামো আপনাআপনি তৈরি হয়ে যায় না। মক্কা চুক্তির বাস্তব কাঠামোও এখনো অনেকাংশে অস্পষ্ট কোনো প্রকাশিত সমন্বিত কমান্ড কাঠামো নেই, স্বয়ংক্রিয় সামরিক প্রতিক্রিয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, আর তিনটি দেশ কখন বা কীভাবে সামরিক হস্তক্ষেপ করবে, সে বিষয়ে নিজেদের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ছেড়ে দিয়েছে, এমন কোনো প্রমাণও নেই। আর বাস্তবিক অর্থে, তা করা তাদের জন্য বিশেষ বুদ্ধিমানের কাজও হতো না।

রিয়াদ আসলে বিকল্প কিনছে

সৌদি আরব গত কয়েক মাসে নতুন করে উপলব্ধি করেছে, বিশাল সম্পদ থাকা সত্ত্বেও একটি রাষ্ট্র কতটা অসহায় হয়ে পড়তে পারে। রিয়াদের হাতে আছে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক কিছু অস্ত্রব্যবস্থা। 

কিন্তু কৌশলগত গভীরতা, গোয়েন্দা তথ্য, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি এবং চূড়ান্ত সংকটে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ছাতা, এসবের ক্ষেত্রে দেশটি এখনো নির্ভরশীল বহিরাগত শক্তির ওপর। আর সেই নিরাপত্তা ছাতা বাস্তবে এখনো একমাত্র ওয়াশিংটনই দিতে পারে। সৌদি আরবের উত্তর তাই যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দেওয়া নয়, বরং কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একচেটিয়া নির্ভরশীলতা কমানো।

মোহাম্মদ বিন সালমান গত কয়েক বছর ধরে সৌদি পররাষ্ট্রনীতির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা করছেন। চীন এখন অপরিহার্য অর্থনৈতিক অংশীদার ও জ্বালানি ক্রেতা। রাশিয়া এখনো কার্যকর অংশীদার। ভারত বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও এশীয় কৌশলের ক্ষেত্রে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। 

গাজা যুদ্ধ ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ এখন কঠিন হলেও দেশটি সম্ভাব্য প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। আর যুক্তরাষ্ট্র সামরিক ক্ষেত্রে এখনো অপরিহার্য হলেও রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই কম অনুমানযোগ্য হয়ে উঠছে। 

এই কাঠামোর মধ্যে পাকিস্তান ও তুরস্ক ওয়াশিংটনের বিকল্প হিসেবে প্রবেশ করছে না, বরং যুক্ত হচ্ছে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি এক অতিরিক্ত স্তর হিসেবে। রিয়াদ আসলে কিনছে বিকল্প।

সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সম্পর্কও পাকিস্তানি রাজনৈতিক বক্তব্যে যতটা রোমান্টিকভাবে উপস্থাপিত হয়, বাস্তবে তা ততটা নয়। এই সম্পর্ক কখনোই সমান দুই অংশীদারের সম্পর্ক ছিল না, আর মক্কার চুক্তিও সেই অসমতা বদলায়নি। 

পাকিস্তানের জন্য সৌদি আরবের আর্থিক গুরুত্ব, সৌদি আরবের জন্য পাকিস্তানের কৌশলগত গুরুত্বের চেয়ে অনেক বেশি। নতুন চুক্তি কেবল পারস্পরিক লেনদেনের পরিধি বাড়িয়েছে, সম্পর্কের সেই মৌলিক অসমতা দূর করেনি।

একটি জোট নয়, একটি প্রতিরক্ষা-বাস্তুতন্ত্র

তবে তুরস্ক এখানে নিয়ে এসেছে একটি ক্রমবর্ধমান সক্ষম প্রতিরক্ষা শিল্প। দেশটি পশ্চিমা বিশ্বের বাইরে সামরিক বাজারের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করছে। আর সম্ভবত পুরো চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক এখানেই নিহিত। 

সৌদি আরবের রয়েছে অর্থ ও বিপুল বাজার। তুরস্কের রয়েছে দ্রুত সম্প্রসারিত মহাকাশ, ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও নৌ-প্রতিরক্ষা শিল্প। আর পাকিস্তানের রয়েছে সামরিক অভিজ্ঞতা, প্রকৌশল সক্ষমতা, তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় এবং সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার দাবি থেকে রপ্তানি চুক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরির প্রবল আগ্রহ। মক্কা চুক্তি এই প্রতিরক্ষা-বাস্তুতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারে।ভারতেরও এখানেই মনোযোগ দেওয়া উচিত, যদিও পাকিস্তানি মহলে যে কারণে এই চুক্তি নিয়ে উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছে, সেই কারণে নয়। সৌদি আরব কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে, এমন সম্ভাবনা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। 

ভারতের সঙ্গে রিয়াদের সম্পর্ক এখন এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী কল্পনার বেদিতে তা উৎসর্গ করার সম্ভাবনা খুবই কম। কিন্তু প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রভাব সম্পূর্ণ বাস্তব। 

সৌদি অর্থায়নে তুরস্ক ও পাকিস্তানের গবেষণা, উৎপাদন ও অস্ত্র উন্নয়ন কার্যক্রম শক্তিশালী হলে এমন এক সামরিক-শিল্পভিত্তি তৈরি হতে পারে, যেখান থেকে পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে ব্যবহারের উপযোগী আরও বেশি সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহ করতে পারবে। এখানেই জোট ও বাস্তুতন্ত্রের পার্থক্য। 

জোট হয়তো কখনো যুদ্ধ করবে না, কিন্তু একটি প্রতিরক্ষা-বাস্তুতন্ত্র সামরিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।

তুরস্কের কৌশলগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা

আঙ্কারার জন্য পরিস্থিতিটি প্রায় আদর্শ। এরদোয়ান যুগে তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটো সদস্য থেকে এমন এক স্বায়ত্তশাসিত মধ্যম শক্তিতে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করেছে, যে একই সঙ্গে পশ্চিমা জোটের ভেতরে এবং তার বাইরেও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারে। 

তুরস্ক এমন দেশগুলোর কাছে ড্রোন বিক্রি করে, যারা পরস্পরকে অপছন্দ করে। রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে, আবার রাশিয়ার প্রতিপক্ষদের অস্ত্র দেয়। ইরানের সঙ্গে কথা বলে, আবার একই সঙ্গে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করে। ফিলিস্তিনের পক্ষে সোচ্চার হয়, আবার নিজের অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় সম্পর্কগুলোও বজায় রাখে। প্রতিরক্ষা রপ্তানিকে ব্যবহার করে পররাষ্ট্রনীতির শিল্পভিত্তিক হাতিয়ার হিসেবে।

মক্কা চুক্তি এই কৌশলের জন্য বাজার ও রাজনৈতিক পরিসর দুটোই বাড়িয়ে দেয়। আঙ্কারা পাবে সৌদি পুঁজি, পাকিস্তানের সহযোগিতা এবং উপসাগরীয় নিরাপত্তায় একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা, কিন্তু ওয়াশিংটনের মতো উপসাগর রক্ষার পূর্ণ দায়িত্ব নিতে হবে না তাকে। তারা অস্ত্র বিক্রি করতে পারবে, বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দিতে পারবে, সামরিক মহড়া করতে পারবে, গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়াতে পারবে এবং নিজেদের এক অধিক স্বায়ত্তশাসিত আঞ্চলিক ব্যবস্থার অন্যতম নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরতে পারবে। 

তবে সৌদি আরবের হয়ে ইরানের বিরুদ্ধে সত্যিই সেনা পাঠাবে কি না তুরস্ক, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন এক প্রশ্ন আর সেই সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।

ইরান ও ওয়াশিংটনের হিসাব

ইরান বিষয়টি খুব ভালোভাবেই বোঝে। তাই তেহরানের প্রতিক্রিয়াকে কেবল এক ‘সুন্নি সামরিক জোট’ নিয়ে ভয় হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ইরানের প্রকৃত উদ্বেগ আরও সূক্ষ্ম। 

রিয়াদ, আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের মধ্যে সমন্বয় বাড়লে ইরানের পক্ষে প্রতিটি প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে আলাদাভাবে মোকাবিলা করার সুযোগ কমে যাবে। একই সঙ্গে ইরানের সীমান্ত ঘিরে তৈরি হবে এমন সামরিক ও শিল্প সক্ষমতা, যা ভবিষ্যতের কোনো সংকটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যদিও এই মুহূর্তে কেউ তেহরানের বিরুদ্ধে তা ব্যবহারের পরিকল্পনা রাখছে না। 

এই চুক্তিকে ইরানবিরোধী হতে হবে না, তবুও এটি ইরানের কৌশলগত পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। আর ঠিক এখানেই মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য প্রকৃত অর্থ এটি ইরানকে ঘেরাও করার চুক্তি নয়, বরং সম্ভাব্য চাপ বা জবরদস্তির বিরুদ্ধে এক নিরাপত্তা-বীমা।

ওয়াশিংটনের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো যখন নিজেদের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ানোর চেষ্টা করে, তখন সেটিকে প্রায়ই দেখা হয় আমেরিকান প্রভাবের পতনের প্রমাণ হিসেবে। আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ওয়াশিংটনের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। 

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর একক নির্ভরতা কমানো মানেই কৌশলগত বিচ্ছেদ নয়। সৌদি সামরিক বাহিনী এখনো মার্কিন অস্ত্রব্যবস্থার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। তুরস্ক এখনো ন্যাটোর সদস্য। পারস্পরিক বৈরিতার নানা পর্যায় পেরিয়ে পাকিস্তানও গত এক বছরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের কিছু কৌশলগত আকর্ষণ নতুন করে উপলব্ধি করেছে। 

তিন দেশের কোনো একটিই গোয়েন্দা তথ্য, রসদ, বিমানশক্তি, নৌক্ষমতা, স্যাটেলাইট সক্ষমতা ও বিস্তৃত প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য নয়। তাই ওয়াশিংটন মক্কা চুক্তিকে হয়তো বোঝা ভাগাভাগির এক কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবেও দেখতে পারে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা মার্কিন স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে এবং স্পষ্টভাবে ইসরায়েলবিরোধী কোনো কাঠামোয় পরিণত না হয়। এই বিষয়ে সৌদি আরব অত্যন্ত সতর্ক থাকবে, পাকিস্তানের রাজনৈতিক বক্তব্য যতই উচ্চকণ্ঠ হোক না কেন।

শিবির নয়, কৌশলগত পোর্টফোলিও

এটি আর শীতল যুদ্ধের যুগ নয়। রাষ্ট্রগুলো এখন একেকটি নির্দিষ্ট শিবির বেছে নিচ্ছে না, বরং গড়ে তুলছে বিভিন্ন কৌশলগত সম্পর্কের একটি ‘পোর্টফোলিও’। সৌদি আরব আমেরিকার নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীল থেকেও চীনা প্রযুক্তি কিনতে পারে, ভারতীয় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে ভাবতে পারে, তুরস্কের প্রতিরক্ষা উৎপাদনে অর্থায়ন করতে পারে এবং পাকিস্তানের কাছ থেকে কৌশলগত নিরাপত্তা সুবিধা নিতে পারে। 

তুরস্ক ন্যাটোতে থেকেও এমন সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে, যার লক্ষ্য ন্যাটোর ওপর নিজের নির্ভরতা কমানো। পাকিস্তান চীনকে ‘আয়রন ব্রাদার’ বলতে পারে, একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সৌদি অর্থের ওপর নির্ভর করতে পারে, তুরস্কের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে পারে, আর একই সঙ্গে দাবি করতে পারে যে কোনো সম্পর্কই তার সার্বভৌমত্ব সীমিত করছে না। 

ইরান ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা করতে পারে, আবার চীন ও রাশিয়ার ওপর ক্রমবর্ধমানভাবে নির্ভর করতে পারে। ভারত কোয়াডে থাকতে পারে, রুশ তেল ও অস্ত্র কিনতে পারে, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে পারে, সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে পারে, আর একই সঙ্গে কোনো দেশের আনুষ্ঠানিক মিত্র হতে অস্বীকৃতি জানাতে পারে।

মক্কা চুক্তিও এই নতুন বিশ্বেরই অংশ। ‘একজনের ওপর হামলা মানে সবার ওপর হামলা’, এই ভাষা শিরোনাম তৈরি করবে, কারণ চুক্তির ভাষা বর্ণনা করা সহজ, কিন্তু পরস্পর জড়ানো স্বার্থের জটিল নেটওয়ার্ক ব্যাখ্যা করা কঠিন। তবে এই চুক্তির প্রকৃত গুরুত্ব সম্ভবত যুদ্ধক্ষেত্র থেকে অনেক দূরে প্রকাশ পাবে যৌথ উদ্যোগ, উৎপাদন লাইন, গোয়েন্দা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, নৌ মোতায়েন, অর্থায়ন ব্যবস্থা এবং এমন এক শিল্পভিত্তি তৈরির মধ্য দিয়ে, যা আজকের তুলনায় তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্রকেই আরও বেশি কৌশলগত বিকল্প দেবে। 

তারা একে অপরের জন্য যুদ্ধ করবে কি না, তা এখনো সন্দেহের বিষয়। কিন্তু তারা একে অপরকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে পারবে কি না, এটিই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

বিশ্বাসের চেয়ে বিকল্প

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। পাকিস্তান এই চুক্তিকে উদযাপন করবে এই প্রমাণ হিসেবে যে তাকে অবশেষে একটি বড় ইসলামী শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তুরস্ক এটিকে উপস্থাপন করবে পশ্চিম-পরবর্তী বিশ্বে নিজের নেতৃত্বের আরেকটি প্রমাণ হিসেবে। 

আর সৌদি আরব সম্ভবত তুলনামূলক কম কথা বলবে, শুধু চেক লিখবে। রিয়াদ, বরাবরের মতো, হয়তো এই লেনদেনের প্রকৃত চরিত্র সবচেয়ে ভালোভাবে বুঝতে পারছে। সৌদি আরব কোনো ‘ইসলামিক ন্যাটো’ কিনছে না তারা কিনছে কৌশলগত বিকল্প: পাকিস্তানের জনবল ও প্রতিরোধক্ষমতার নিশ্চয়তা, তুরস্কের শিল্প ও প্রযুক্তি এবং কিছু অতিরিক্ত কূটনৈতিক ওজন। 

পাকিস্তান ও তুরস্ক কিনছে সৌদি পুঁজি, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং সম্ভাব্য বিশাল প্রতিরক্ষা বাজারে প্রবেশাধিকার। কেউ কাউকে নিজের জীবন উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

নতুন মধ্যপ্রাচ্যের এই জোটগুলো বিশ্বাসের ওপর নির্মিত হচ্ছে না। এগুলো নির্মিত হচ্ছে এই উপলব্ধির ওপর যে, বিশ্বাস এখন অত্যন্ত ব্যয়বহুল এক পণ্য। 

ভূমধ্যসাগর থেকে সিন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত বর্তমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হয়তো সেই রাষ্ট্র নয়, যার সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র রয়েছে। বরং শক্তিশালী সেই রাষ্ট্র, যে টিকে থাকতে পারে ঠিক সেই মুহূর্তেও, যখন প্রত্যেক মিত্র আবিষ্কার করে যে তার প্রকৃত স্বার্থ আসলে অন্য কোথাও নিহিত।

ইতালীয় সাংবাদিক ফ্রান্সেসকা মারিনোর কলামের অনুবাদ করেছেন মিশর আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী- জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান

প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স
Logo

অবিশ্বাসের বিশ্বে এক নতুন জোট

www.dailyneighbour.com
নিউজ লিংক কমেন্টে
Aug 16, 2026