‘ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ’-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর গাজায় ইসরাইলি নিধনযজ্ঞ শুরু হলে এই চর্চা আরও ত্বরান্বিত হয়। ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অসম্ভব করে তোলাই এর মূল উদ্দেশ্য।
গত সপ্তাহে ফিলিস্তিন ও ইসরাইল বিষয়ক জাতিসংঘের শীর্ষ তদন্ত সংস্থা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে, গাজায় হামলার প্রধান অংশ হিসেবে ইসরাইলি বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনে শিশুদের ওপর হওয়া ক্ষতির পুরো চিত্র খতিয়ে দেখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্নাইপার ও ড্রোনের মাধ্যমে নিখুঁত গুলি, আটক অবস্থায় নির্যাতন, প্রজননগত সহিংসতা এবং স্কুল ও হাসপাতাল ধ্বংসের মতো বিষয়গুলো।
জাতিসংঘের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইল ২১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আরও ৫ হাজার ১৬০ জন শিশু ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ১৫ হাজার শিশু তাদের মাকে হারিয়েছে।
জাতিসংঘের নথিবদ্ধ করা একটি ঘটনায় দেখা যায়, আল-নাসর শিশু হাসপাতালে ইসরাইলি বাহিনী বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় চার নবজাতকের মৃত্যু হয়। পরে বিকল হয়ে যাওয়া লাইফ সাপোর্ট মেশিনের সঙ্গে যুক্ত অবস্থায় তাদের পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়।
গণহত্যার শুরুতে জাতিসংঘের হিসাবে গাজায় ৫০ হাজার অন্তঃসত্ত্বা নারী ছিলেন এবং প্রতি মাসে ৫ হাজার ৫০০ শিশু জন্ম নিচ্ছিল। অনেকেরই জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল, যা ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর কারণে অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
সে সময় গর্ভপাতের হার ৩০০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। ব্যাপক অপুষ্টি, রক্তশূন্যতা এবং প্রসবপূর্ব প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে অকাল জন্ম, কম ওজনের শিশু এবং প্রসবের সময় মারাত্মক রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
‘একটি শিকারি রাষ্ট্র’
প্রগ্রেসিভ ইন্টারন্যাশনালের সহায়তায় প্রস্তুত করা ১৮৮ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে ‘এ প্রিডেটরি স্টেট: ইসরাইলি সিস্টেমিক সেক্সুয়ালাইজড অ্যান্ড জেন্ডারড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট প্যালেস্টাইনস’ (একটি শিকারি রাষ্ট্র: ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলের পদ্ধতিগত যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা)। এতে উল্লেখ করা হয়, ইসরাইল গাজায় বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটারি প্যাড ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের প্রবেশ বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক ফিলিস্তিনি নারী ‘মাসিক বন্ধ করতে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি বা ঘরে তৈরি প্যাড ব্যবহার করতে বাধ্য হন’।
২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত গবেষণার ওপর ভিত্তি করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। এতে বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য, ইসরাইলের প্রকাশ করা গোপন নথি, ফিলিস্তিনিদের মৌখিক ইতিহাস, একাডেমিক গবেষণা, প্রামাণ্য দলিল, গণমাধ্যমের খবর, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর নথি এবং জাতিসংঘের প্রতিবেদন ও বিবৃতি যুক্ত করা হয়েছে।
গাজার বোমা বিধ্বস্ত হাসপাতালগুলোতে জ্বালানি, বিদ্যুৎ, অ্যানেসথেসিয়া বা জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম নেই। ফলে ফিলিস্তিনি নারীরা ভিড়ভাট্টাপূর্ণ আশ্রয়কেন্দ্র, ঘরবাড়ি বা ধ্বংসস্তূপে ঘেরা রাস্তায় সন্তান জন্ম দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
গাজায় কাজ করা আন্তর্জাতিক চিকিৎসকেরা অ্যানেসথেসিয়া ছাড়া সিজারিয়ানসহ নানা অস্ত্রোপচার করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। সদ্য মা হওয়া নারীরা ডায়াপার, খাবার, পানি ও শিশুর গুঁড়ো দুধের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাচ্ছেন না, যা বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় খুব সাধারণ বিষয়।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গাজার ওপর ইসরাইলের এই হামলা আংশিকভাবে ‘প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এবং অন্যান্য দৈনন্দিন অবকাঠামোর পদ্ধতিগত ধ্বংসের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে, যা ফিলিস্তিনিদের জীবনকে কেবল ঝুঁকিপূর্ণই নয়, অসম্ভব করে তুলেছে।’
ইসরাইল গাজার প্রসূতি ওয়ার্ড ও আইভিএফ ক্লিনিকগুলো ধ্বংস করেছে। ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ জানিয়েছে, সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত সাদা ফসফরাস এবং অন্যান্য বিষাক্ত অস্ত্রের ব্যবহার ‘প্রজননক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি ও বংশানুক্রমিক প্রভাব ফেলবে’।
হাজার হাজার ফিলিস্তিনি মা বিধবা বা রাজবন্দিদের স্ত্রী হিসেবে তাদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ও রক্ষাকর্তা হিসেবে বেঁচে আছেন। অন্যদিকে পদ্ধতিগত উচ্ছেদ ও কারাবাসের কারণে আরও হাজার হাজার নারী তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ব্যাপক অনাহার, বাস্তুচ্যুতি এবং রোগের প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও গাজার ফিলিস্তিনি মায়েদের ওপর নতুন জীবনের জন্ম দেওয়া এবং সন্তানদের যত্ন নেওয়ার মতো অসম্ভব দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।’মায়েদের হত্যা
ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভ গাজার দুই নারী রানিয়া আবু আনজা এবং জোমানা আরাফার ঘটনা বিশেষভাবে তুলে ধরেছে।
আবু আনজা ১০ বছর ধরে আইভিএফ চিকিৎসা নেওয়ার পর অবশেষে নাঈম ও উইসাম নামে যমজ সন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু ২০২৪ সালের মার্চে এক ইসরাইলি বিমান হামলায় স্বামীসহ তার ওই দুই শিশু প্রাণ হারায়।
জোমানা আরাফা যমজ সন্তানের জন্ম দেওয়ার দুদিনের মাথায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ঘোষিত ‘নিরাপদ মানবিক অঞ্চলে’ আশ্রয় নেওয়া অবস্থায় তার দুই শিশু এবং নিজ মাসহ নিহত হন। তার স্বামী নবজাতকদের জন্মনিবন্ধন আনতে যাওয়ায় প্রাণে বেঁচে যান।
প্রতিবেদনে এসব ঘটনাকে কেবল ‘হিমশৈলের চূড়া’ বা বিশাল ঘটনার সামান্য অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপর গঠিত স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পরিকল্পিতভাবে প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালিয়েছে। প্রসূতি ওয়ার্ড, প্রসবপূর্ব চিকিৎসা কেন্দ্র, ফার্টিলিটি ক্লিনিক এবং নবজাতকদের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলো প্রায় ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
গাজার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সেখানে ইসরাইলের কঠোর খাদ্য নিষেধাজ্ঞার কারণে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
ফিলিস্তিনিদের বংশবৃদ্ধি নিয়ে ইসরাইলের ঐতিহাসিক ভয়ের বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এতে উল্লেখ করা হয়, ১৯৯৫ সালে ইসরায়েলি ভূগোলবিদ আরনন সোফার সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘ইসরায়েল সবচেয়ে বড় যে হুমকির সম্মুখীন, তা হলো আরব নারীদের গর্ভ।’ তিনি দাবি করেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্মহার ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী (১৯৬৯-১৯৭৪) গোল্ডা মেয়ার মন্তব্য করেছিলেন যে, ‘আরও একটি ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নিতে যাচ্ছে’—এই ভাবনা থেকেই তার দুঃস্বপ্ন শুরু হতো।
ফিলিস্তিন ফেমিনিস্ট কালেক্টিভের এ প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় অধিকৃত ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের জন্য নিযুক্ত জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা আলবানিজ বলেন, ‘এটি এমন একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ, যা ফিলিস্তিনিদের জীবন—দেহ, বসতবাড়ি, পরিবার, প্রজননগত অস্তিত্ব এবং এমনকি মৃতদেরও নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন এটা বোঝার সময় এসেছে যে, ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলো—যার মধ্যে এই প্রতিবেদনে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাও অন্তর্ভুক্ত—কেবল বিচ্ছিন্ন কোনো নির্যাতনের সমষ্টি নয়; বরং এটি আধিপত্য বিস্তার, নিপীড়ন এবং নিশ্চিহ্ন করার একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
